দিল্লি বিস্ফোরণের প্রেক্ষাপটে ভারতে ইসলামবিদ্বেষের পুনরুত্থান, কাশ্মীরে গ্রেপ্তার অভিযানে তৎপরতা

Hemait Sujon
3 Min Read
দিল্লিতে বিস্ফোরণের পর ভারতে আবার ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে, কাশ্মীরে চলছে ধরপাকড়

ভারতের দিল্লিতে জনাকীর্ণ সড়কে ভয়াবহ গাড়ি বিস্ফোরণে ১৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনার ২৬ দিন আগে শ্রীনগরের উপকণ্ঠ নওগামে একটি সবুজ শিরোনামযুক্ত প্যাম্ফলেট দেখা যায়। ভাঙা উর্দুতে লেখা ওই পোস্টারে পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠী জয়েশ–ই–মোহাম্মদ (JeM)–এর নাম উল্লেখ ছিল এবং এতে নিরাপত্তা বাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া স্থানীয়দের উদ্দেশে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

পোস্টারে বলা হয়—“সতর্কবার্তা না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” শ্রীনগর–জম্মু মহাসড়কের ব্যবসায়ীদেরও সতর্ক করে বলা হয়, সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করলে পরিণাম ভালো হবে না।

একসময় এই ধরনের পোস্টার কাশ্মীরে অস্বাভাবিক ছিল না। বিশেষ করে ১৯৯০ ও ২০০০–এর দশকের শুরুতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময়ে এ ধরনের প্রচারণা নিয়মিত দেখা যেত। তবে ২০১৯ সালে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল হওয়ার পর এমন ঘটনাও কমে আসে, সাথে সশস্ত্র সহিংসতাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৫৯৭টি হামলা নথিবদ্ধ হলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৪৫–এ।

প্যাম্ফলেটের সূত্র অনুসন্ধানে গ্রেপ্তার অভিযান

নওগামে পোস্টার উদ্ধারের পর নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে আটক করে। এদের একজন হলেন দক্ষিণ কাশ্মীরের সোপিয়ান জেলার বাসিন্দা এবং শ্রীনগরের এক মসজিদের পেশ ইমাম ইরফান আহমেদ—যিনি স্থানীয়ভাবে একজন ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত।

ইরফানকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় উঠে আসে আরেক ব্যক্তির নাম—আদিল রাঠোর। কুলগামের ওয়ানপোরা গ্রামের এ বাসিন্দাকে পরে উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ দাবি করেছে, অনন্তনাগ গভর্নমেন্ট মেডিকেল কলেজে তাঁর লকার থেকে একটি অ্যাসল্ট রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে। রাঠোর ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ওই কলেজে কর্মরত ছিলেন।

রাঠোরের তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় আরেক কাশ্মীরি চিকিৎসক মুজাম্মিল শাকিল গণাইকে। দিল্লির কাছে ফরিদাবাদের আল–ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত গণাইয়ের নামে ভাড়া নেওয়া দুটি বাড়িতে অভিযানে পুলিশ ২,৯০০ কেজি দাহ্য রাসায়নিক এবং অস্ত্র উদ্ধার করার দাবি করেছে।

আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সন্দেহ

জম্মু–কাশ্মীর পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার অভিযানের মাধ্যমে তারা জয়েশ–ই–মোহাম্মদ ও আনসার গাজওয়াত–উল–হিন্দ (AGuH)–সংযুক্ত একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সনাক্ত করতে পেরেছে।

AGuH হলো আল–কায়েদা–সম্পৃক্ত নিষিদ্ধ সংগঠন, যা ২০১৯ সালে নিহত কমান্ডার জাকির রশিদ কাশ্মীরে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সংগঠনটি প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও ভারতীয় পুলিশের দাবি, পাকিস্তান থেকে নতুন নেতৃত্ব আসায় গোষ্ঠীটি আবার সক্রিয় হয়েছে।

এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে—যার মধ্যে রয়েছেন ইমাম ইরফান আহমেদ, চিকিৎসক রাঠোর ও গণাইসহ আরও চারজন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌয়ের একজন নারীও আছেন।

বিস্ফোরণের আগেই নজরে উমর নবী

তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনুসন্ধানে তাঁরা উমর নবী নামের আরেক কাশ্মীরি চিকিৎসকের ব্যাপারে তথ্য পান।

তবে নবীকে আটক করার আগেই গত সোমবার নয়াদিল্লিতে লালকেল্লার কাছে গাড়িবোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তদন্তকারীদের ধারণা, ২৯ বছর বয়সী উমর নবীই বিস্ফোরকভর্তি গাড়িটি চালাচ্ছিলেন।

নওগামে নতুন করে প্যাম্ফলেট দেখা দেওয়ার পর তিন সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে তল্লাশি অভিযানের মধ্যেই বিস্ফোরণের এই ঘটনা ভারতের অভ্যন্তরে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

Share This Article
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।